গুল বিষয়ক আইন
আইন বিষয়ক সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: জি.ডি. কি ?
উত্তর: জি. ডি. হচ্ছে - জেনারেল ডায়েরি বা সাধারণ ডায়েরি। এই ডায়েরি
হলো অপরাধ বা ক্ষতি সংঘটনের আশঙ্কাজনিত বিবরণ। আপনি যদি আশংকা করেন যে, কেউ আপনার
ক্ষতি করতে পারে বা আপনার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছেএমন ক্ষেত্রে আপনি আইনের
সহায়তা চান, তাহলে উক্ত আশংকার বিবরণ দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবার জন্য থানায়
দরখাস্ত দেয়াকেই জেনারেল ডায়েরি বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা বলে। এ বিষয়ে ফৌজদারী
কার্যবিধি ১৫৪/১৫৫ ধারায় বলা আছে।
প্রশ্ন: কোন কোন ক্ষেত্রে জি.ডি. করা যায় ?
উত্তর: আপনার বা আপনার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে যে কোন ব্যক্তি
কর্তৃক অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা থাকলে বা কেউ হুমকি দিলে, কিছু হারিয়ে গেলে বা
হারানোর আশঙ্কা থাকলে, বাড়ির কাজে অপরিচিত লোক নিয়োগ দিলে বা না বলে চলে গেলে
সেক্ষেত্রে জিডি করতে হয়।
প্রশ্ন: জি.ডি.তে কি কি থাকে ?
উত্তর: জিডিতে অবশ্যই সুস্পষ্টভাবে বিষয় সম্পর্কে এবং স্থান, সময়, তারিখ
উল্লেখ করতে হবে।
প্রশ্ন: গৃহকর্মী নিয়োগ করার সময় কি বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় ?
উত্তর: বাড়ির কাজের জন্য গৃহপরিচারিকা বা গৃহকর্মী হিসেবে ছেলে বা
মেয়ে রাখার আগে তার এবং তার পরিবার সম্পর্কে যতটা সম্ভব বিস্তারিত খোঁজ খবর জেনে
নিন। তাকে কাজে নিযুক্ত করার সময় একটি পাসপোর্ট সাইজ ছবি তুলে নিজের কাছে রাখুন
এবং তার ছবি ও নাম ঠিকানা দিয়ে নিকটস্থ থানায় জিডি করুন। প্রয়োজনে তার বাড়িতে লোক
পাঠিয়ে খোঁজ নিন।
প্রশ্ন: গৃহকর্মী ব্যতীত বাসার কেউ হারিয়ে গেল কি করতে হবে ?
উত্তর: প্রায়ই পরিবারের বয়স্ক কোন ব্যক্তি কিংবা শিশু অথবা
প্রতিবন্ধী সদস্য এবং কাজের ছেলে বা মেয়ে নিখোঁজ হবার খবর পত্রিকায় ছাপা হয়। এ
ধরনের কোন নিখোঁজ বা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা যদি আপনার পরিবারে ঘটে সেক্ষেত্রে সঙ্গে
সঙ্গে নিকটস্থ থানায় আগে একটি জিডি বা সাধারণ ডায়েরি করবেন। এরপর কোন জাতীয় অথবা
স্থানীয় পত্রিকায় হারানো বিজ্ঞাপন দেবেন। এলাকায় মাইকিং করতে ভুলবেন না।
প্রশ্ন: যদি মূল্যবান দলিল পত্রাদি হারিয়ে যায় বা মূল্যবান কাগজ পত্র
হারিয়ে যায় তখন কি করতে হবে?
উত্তর:মূল্যবান কাগজপত্র, দলিলাদি হারিয়ে গেলে প্রথমেই নিকটস্থ থানায়
একটি জিডি বা সাধারণ ডায়েরি করতে হবে। এরপর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিবেন, যাতে এসকল
মূল্যবান কাগজপত্র কেউ পেলে ফিরিয়ে দিতে পারে। এছাড়াও ভবিষ্যতে আপনার আইনগত ভিত্তি
শক্ত থাকবে। কারণ এই দলিল বা কাগজপত্র না থাকায় আপনি বিপদে পড়তে পারেন। যে কাগজ বা
দলিল হারিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর আবার নতুন করে সেই কাগজপত্র বা দলিল
প্রদানের আবেদন জানাতে পারবেন এই ভিত্তির কারণে।
প্রশ্ন: যদি কেউ কাউকে জোর করে বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে সাদা কাগজে বা
লিখিত বা সাদা স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়, সে ক্ষেত্রে করণীয় কি ?
উত্তর:কেউ যদি জোর করে বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে সাদা কাগজে বা লিখিত বা
সাদা স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়, সেক্ষেত্রেও বিষয়টি অবগত করার জন্য যত
তাড়াতাড়ি সম্ভব স্থানীয় থানায় জিডি করতে হবে এবং উদ্ধারের জন্য আদালতের আশ্রয় নিতে
হবে।
প্রশ্ন: জি.ডি. করতে থানায় কোন টাকা পয়সা লাগে কি ?
উত্তর: না, জিডি করার জন্য থানায় কোন টাকার প্রয়োজন হয় না। এর জন্য
কোন ফি ধরা নেই। সংশ্লিষ্ট থানায় গেলেই দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা জিডি লিপিবদ্ধ
করবেন।
মিথ্যা মামলার আইনি প্রতিকার
মাদারীপুর অর্পিত সম্পত্তি দপ্তরের তহশিলদার কপিলকৃষ্ণ গোলদার মাদারীপুর
প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফরিদা বেগমসহ ছয়জনকে আসামি করে একটি
সিআর মামলা দায়ের করেন (সিআর মামলা নম্বর ৫০৯/২০০০)। তহশিলদার কপিলকৃষ্ণ
গোলদার আসামিদের বিরুদ্ধে এই মর্মে অভিযোগ করেন যে তর্কিত সম্পত্তি
অর্পিত সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও ওই সম্পত্তি গ্রাস করার লক্ষ্যে আসামিরা
পরস্পর যোগসাজশে তাঁদের পক্ষে জমিটি ক্রয়ের একটি জাল দলিল তৈরি করেছেন, যা
দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ধারায় দণ্ডযোগ্য অপরাধ।
বিজ্ঞ প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট আসামি ফরিদা বেগমের স্বামীসহ (২ নম্বর
আসামি আ· মজিদ মিয়া) ছয়জন আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আমলে নেন।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দায়ের করেন। ১ নম্বর আসামি (ফরিদা বেগম) এবং ৩ নম্বর
আসামি ও অন্যরা স্বেচ্ছায় বিজ্ঞ আদালতে হাজির হলে তাঁদের হাজতে প্রেরণ করা
হয়। এর পরপরই আসামি ফরিদা বেগমের স্বামী আ· মজিদ মিয়া (২ নম্বর আসামি) মারা
যান। মানবিক কারণে ফরিদা জামিন পান।
এরপর বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন উপরিউক্ত সিআর মামলার (নম্বর
৫০৯/২০০০) সামগ্রিক কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ করে আসামিরা হাইকোর্ট বিভাগে
একটি রিভিশনাল পিটিশন দায়ের করেন। তাঁদের যুক্তি, তাঁরা আইনগতভাবেই তর্কিত
সম্পত্তি আইনানুগ মালিকের কাছ থেকে অর্জন করেছেন। এমনকি দেওয়ানি আদালত থেকে
তাঁদের মালিকানা প্রাপ্তির ডিক্রিও অর্জন করেছেন। এ-সংক্রান্ত দলিলপত্রও
তাঁরা পিটিশনের সঙ্গে সংযুক্ত করেন। (৫৯ ডিএলআর, ৩২৮)
হাইকোর্ট বিভাগের রায়ঃ সরকারি কর্মচারী কপিলকৃষ্ণ গোলদার দণ্ডবিধির ৪৬৭,
৪৬৮, ৪৭১ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের অভিযোগে ফরিদা বেগমসহ অন্যদের
বিরুদ্ধে যে সিআর মামলাটি (মামলা নম্বর ৫০৯/২০০০) দায়ের করেছিলেন, তা আইন
অনুযায়ী চলতে পারে না। কিন্তু এ রকম একটি ভ্রান্ত মামলার কারণে ওই মামলার
আসামি ফরিদা বেগমের জীবনে মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছিল। ফরিদা বেগম হাজতে
থাকাকালে তাঁর স্বামী ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন। একজন সরকারি কর্মচারী,
যাঁর মূল দায়িত্ব যথোপযুক্ত আইনানুগ প্রক্রিয়ায় অর্পিত সম্পত্তি রক্ষা
করা, খেয়ালের বশে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে কোনো নাগরিকের অপূরণীয় ক্ষতি
করা তাঁর দায়িত্ব নয়। এরূপ অবহেলা ও ঔদাসীন্য দণ্ডবিধির ২১১ ধারায়
শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ওই অভিযোগে কপিলকৃষ্ণ গোলদারের বিরুদ্ধে ফরিদাসহ
অন্য ভুক্তভোগীরা মামলা করতে পারেন। তাঁরা আলাদাভাবে ক্ষতিপূরণের জন্যও
মামলা দায়ের করতে পারেন।
আমার ব্যক্তিগত অনুমান, আমাদের দেশে দায়ের করা ফৌজদারি মামলাসমূহের শতকরা
প্রায় ৭০ ভাগ মামলা উল্লিখিত (৫৯ ডিএলআর, ৩২৮) মামলাটির মতো। আমাদের দেশের
গরিব মানুষদের হয়রানি করার জন্য মিথ্যা অভিযোগে দায়ের করা হয়ে থাকে। সবার
পক্ষে ফরিদা বেগমের মতো উচ্চ আদালতে যাওয়া সম্ভব হয় না। নানা প্রতিকূলতার
কারণে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের
অভিযোগ এনে পাল্টা মামলা করাও সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় কেবল সংশ্লিষ্ট
আদালতই পারে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারা অনুযায়ী
মিথ্যা অভিযোগ আনয়নকারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।
ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশঃ মিথ্যা নালিশ আনয়নকারী সব ব্যক্তির বিরুদ্ধে
ফৌজদারি কার্যবিধি ২৫০ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে
ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ করা যায়। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা আমলযোগ্য নয়, এ
রকম কোনো মামলায় মিথ্যা প্রতিবেদন দিলে তাঁর বিরুদ্ধেও এ ধারা অনুযায়ী
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ প্রদান করা যায়।
রিভিশনঃ দায়রা জজ আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩৫-এর ৪৩৯(এ) ধারা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ রিভিশন করতে পারেন।
আপিলঃ ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০(৩) ধারা অনুযায়ী, দায়রা জজ আদালতে আপিল করা যায়।
আমাদের দেশের বিজ্ঞ আদালতসমূহ যদি সতর্কতার সঙ্গে নিয়মিতভাবে মিথ্যা
মামলাসমূহের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা অভিযোগ
আনয়নকারী পক্ষকে কারাদণ্ড ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ
প্রদানের আদেশ প্রদান করেন, তাহলে প্রথম দিকে আদালতে কাজের পরিধি বাড়লেও
একটা পর্যায়ে মিথ্যা মামলা দায়েরের সংখ্যা দ্রুতগতিতে হ্রাস পাবে। ফলে
একদিকে যেমন স্তূপীকৃত মামলার সংখ্যা হ্রাস পাবে, অন্যদিকে মিথ্যা মামলায়
ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ অন্তত তাদের আর্থিক ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পারবে।
অমিত কুমার দে
জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, বরগুনা
তথ্যসূত্র : prothom-alo.